জালালিয়তের সম্রাট হযরত বাবা ভান্ডারী (ক.)

Raozan IT

জালালিয়তের সম্রাট হযরত বাবা ভান্ডারীঃ উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান অধ্যাত্মবাদের মিলনকেন্দ্র হলো পবিত্র ‘ মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ ’। এই দরবার শরীফে অধ্যাত্ম শরাফতের প্রতিষ্ঠাতা , প্রথম ও প্রধান অলীয়ে কামেল গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী মওলানা শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) যুগের প্রয়োজন অনুসারে শরিয়তী বিধি নিষেধের সাথে সমন্বয় করে সহজ, সরল ‘অর্গলমুক্ত ঐশী প্রেমবাদ’ বা বেলায়তে মোতলাকা যুগের প্রবর্তন করেন। যা জাতি,ধর্ম, বর্ণ,গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য সহজে অনুশীলন যোগ্য। ধর্মীয় সম্প্রীতি, সৃষ্টিকর্তার একত্ব, ঐশী প্রেম, শান্তি ও ন্যায় ধর্ম ছিলো গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর মূলমন্ত্র।

গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী মওলানা শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) এঁর পরবর্তী মাইজভাণ্ডারী দর্শন প্রচার ও প্রসার হয় বাবা ভাণ্ডারী হজরত গোলামুর রহমান (ক.) এঁর হাত ধরে। তিনি ছিলেন গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর আপন ভ্রাতুষ্পুত্র । তিনি গাউছুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.) পরবর্তী আধ্যাত্মিক সিংহাসনের উত্তরাধিকারী অলিয়ে কামেল। যিনি ১২৭০ বাংলা ২৭ আশ্বিন , ১০ অক্টোবর ১৮৬৫ ইং এবং ১২ জমাদিউসসানী ১২৭০ হিজরী সোমবার ভোর বেলা চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানার অন্তর্গত মাইজভাণ্ডার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

আরো পড়ুনঃ জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়ায় পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ সম্পন্ন

উনার পিতার নাম হজরত সৈয়দ আবদুল করিম শাহ্‌ সাহেব (যিনি গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর আপন ভাই ) এবং মাতার নাম হজরত সৈয়দা মুশাররফজান বেগম। শৈশব কাল থেকেই তিনি গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর সোহবত প্রাপ্ত হন। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তিনি বাবা ভাণ্ডারী (ক.) কে কোলে তুলে নিয়ে বলেন , এই শিশু আমার বাগানের শ্রেষ্ঠ গোলাপ ফুল। হজরত ইউসুফ (আ.) এঁর চেহারা তাঁর মধ্যে আসিয়াছে । তাঁকে যত্ন করিও । আমি তাঁর নাম গোলামুর রহমান রাখিলাম।

মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ

অসাধারণ জ্ঞান , খোদাভক্তি ও চারিত্রিক মাধুর্য দেখে গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী মওলানা শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) বাবা ভাণ্ডারীকে জাহেরী ও বাতেনী জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় শিক্ষিত করে তোলেন। জন্মের পরপরই শিশু বাবা ভাণ্ডারীকে দেখে উনার আত্মীয় স্বজন আনন্দে বলে উঠেন , এ শিশু মানব নয় , বরং সম্মানিত ফেরেশতা। আমরা এরূপ সম্মানিত ছেলে আর দেখিনি। নিশ্চয়ই তিনি ভবিষ্যতে একজন আল্লাহর অলি হবেন । বাবা ভাণ্ডারী (ক.) শিক্ষা জীবন শুরু হয় গ্রামের ফোরকানীয়া মাদ্রাসা থেকে। একজন বিখ্যাত আলেম সেই মাদ্রাসাটির শিক্ষক ছিলেন। সেই শিক্ষক বাবা ভান্ডারী (ক.) এঁর পিতাকে একদিন বললেন, আপনার ছেলে একদিন আদর্শ পুরুষ হবে। তার স্পর্শে মাটির মানুষ সোনায় পরিনত হবে। বাবা ভান্ডারী (ক.) এর পিতা শিক্ষকের কথায় মুগ্ধ হন। পিতা তখন প্রথম পাঠদানের জন্য গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী মওলানা শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) এঁর কাছে নিয়ে যান।

গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী বাবা ভাণ্ডারীকে দেখে মৃদু হেসে বললেন, তুমি কালামুল্লাহ পড়বে ? আচ্ছা পড় দেখি। এরপর গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী পবিত্র কোরআন পাঠ ও দরুদ শরীফ পড়ে মহান আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করেন। গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর অনুমতি নিয়ে বাবা ভাণ্ডারী (ক.) ফোরকানীয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দেন। অবাক করা ব্যাপার হলো তিনি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিলেন ঠিক কিন্তু মন সর্বদাই চাইতো গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর সান্নিধ্য লাভ। তাই প্রায় তিনি গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর সান্নিধ্যে থাকতেন। মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে পিতার আদেশ মত ঘরের কাজও করতেন। এমনকি মাঠে গরুও চরাতেন। গরু চরানোর সময় গরুকে বলতেন, দেখ, ফসল নষ্ট করিস না। গরু ঠিক উনার কথা মতো আইলের উভয় পার্শ্বের ঘাস খেয়ে উদর পূর্ণ করত, কিন্তু ফসলের কোন ক্ষতি করত না।

হযরত বাবা ভান্ডারী

ফোরকানীয়া মাদ্রাসার শিক্ষা জীবন শেষে তিনি চট্টগ্রাম সরকারী মোহছেনীয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। তিনি তখন থেকেই ছিলেন বিনয়ী, সদালাপী, স্বল্পভাষী ও স্বল্পহারী । ছোটবেলা থেকেই তিনি নামায, রোজা, কোরআন এবং প্রতিনিয়ত তাহাজ্জুত নামায আদায় করতেন। ২৩ বছর বয়সে সংসারের প্রতি বাবা ভাণ্ডারী (ক.) এঁর উদাসীন হয়ে পড়েন। তাই সংসারের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণের জন্য উনার পিতামাতা ফটিকছড়ি থানার অন্তর্গত সুয়াবিল গ্রামের সৈয়দ আল-হাছানী সাহেবের প্রথম কন্যা মোছাম্মদ জেবুন্নেছা বেগমের সাথে বিবাহ দেন। তারপরও বাবা ভাণ্ডারীর উদাসীনতা কমে না। ২৫ বছর বয়সে বাবা ভাণ্ডারীর (ক.) জমাতে উলার ফাইনাল পরীক্ষার্থী । এখন পরীক্ষার আগের দিন থেকে গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর দোয়া নিতে গেলে , দেখেন তিনি সেখানে নেই।

পরে গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর সাক্ষাৎ পাওয়া যায় দরবার শরীফের দক্ষিণে কাটাখালী নামক তীরে সরিষা ক্ষেতের ধারে শিষ্যদের সাথে। বাবা ভাণ্ডারী (ক.) মস্তক নত করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তখন গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) অপলক নয়নে বাবা ভাণ্ডারী (ক.) এঁর দিকে চেয়ে জজবা হালে অনেক কিছু বললেন । পরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরলে বাবা ভাণ্ডারীকে বলেন , “ তোমার পরীক্ষা হয়ে গেছে” এরপর একজন মুরিদকে নির্দেশ দেন উনার জুব্বাটি আনার। গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর জুব্বাটি প্রথমে নিজে পরিধান করেন পরে বাবা ভাণ্ডারীকে পরিধান করিয়ে দেন এবং অনুমতি দেন শহরে যাওয়ার। এটি ছিল আধ্যাত্মিকভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। কারণ এর মাধ্যমে গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) বাবা ভাণ্ডারী (ক.) কে ফয়েজ রহমত বর্ষণ করে মহান অলির সনদ প্রদান করেন। এভাবে বাবা ভাণ্ডারী (ক.)আধ্যাত্মিকতার অনন্ত পরীক্ষায় পাশ করলেন ।

যেখানে পার্থিব পরীক্ষার ফল কিছুই না। এরপর তিনি জমাতে উলার পরীক্ষা দিতে গেলেন , কিন্তু দুই দিন পরীক্ষা দিয়ে তৃতীয় দিন কাগজ, কলম ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে জজবা হালতে অনেক দুর্বোধ্য কথা বলে ফেলেন সাথে গজল গাওয়া শুরু করলেন। এতে পরীক্ষার হলে সকলে অবাক হয়ে গেলেন। সকলে বুঝালেন পরীক্ষা দেয়ার জন্য কিন্তু কোনো কাজ হল না, উনার কাছে দুনিয়ার পরীক্ষা অতি নগণ্য । তিনি তখন উনার গুরু গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) কে দেখছেন আর বলে উঠছেন,“ এসেছেন আপনি? এসেছেন? আপনি কষ্ট স্বীকার করে কেন এসেছেন ? আমি মাথায় ভর দিয়ে হেঁটে আপনার খেদমতে হাজির হতাম। ” কথাটি বলার সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে পড়েন । এরপর বাবা ভাণ্ডারীকে পবিত্র দরবার শরীফে নিয়ে আসা হয়। তারপর শুরু হয় উনার কঠোর আধ্যাত্মিক সাধনা। তিনি সর্বদা গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর খেতমতে হাজির থাকতেন। বাবা ভাণ্ডার (ক.) এঁর কঠোর সাধনা দেখে উনার পিতামাতা উদ্বিগ্ন হয়ে রেয়াজতের ভার কমিয়ে দেয়ার জন্য গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর কাছে আরজ করেন।

তখন গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) পিতামাতাকে উত্তর দিলেন, “ তিনি ইউসুফ (আ.) হতে চান আর তোমরা তাঁকে মৌলভী বানাতে চাও। খোদা তোমাদিগকে মান্না ও ছালওয়া নামক স্বর্গীয় খাদ্য খাওয়াতে চান। আর তোমরা পেঁয়াজ, রসুন খেতে চাও। তোমরা কি উৎকৃষ্ট বস্তুর বিনিময়ে নিকৃষ্ট বস্তু চাও ? অধিকাংশ সময় তিনি গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর চরণ যুগল জড়িয়ে ধরতেন। এমনকি অনেক সময় বাবা ভাণ্ডারীকে (ক ) জোরপূর্বক বন্দি করে রাখতে হতো। তখন তিনি চিৎকার করে বলতেন, “ ছেড়ে দাও দেখতে দাও , আমার প্রাণ যায়। ”

এভাবে চিৎকার করতে করতে বেহুশ হয়ে যেতেন। জ্ঞান ফিরে আসার সাথে সাথে আবার ঘরের বেড়া বা দরজা ভেঙ্গে দৌড়ে গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) চরণ যুগলে ঝাপিয়ে পড়তেন। গুরুর চরণে ঝাপিয়ে পড়বেনই তো ! কারণ সেখানেই যে বাবা ভাণ্ডারী পরম শান্তি খুঁজে পান । যেভাবে মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (রহ.) গুরু সামছে তাবরীজ (রহ.) এঁর আধ্যাত্মিক প্রেমে পার্থিব জগতের মোহ ত্যাগ করেছিলেন। তদ্রূপ হজরত বাবা ভাণ্ডারীও।

গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর সোহবতে বাবা ভাণ্ডারী (ক.) কঠোর রেয়াজত সাধনা করে শরীয়ত, তরিকত, হাকীকত ও মারফত তথা আধ্যাত্মিক জগতের চরম সোপানে পৌঁছান। যার ফলে উনার আত্মায় গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর যাবতীয় আধ্যাত্মিক শক্তি সঞ্চারিত হয়। বাবা ভাণ্ডারী( ক.) দীর্ঘ দিন জলে- স্থলে , পাহাড়-পর্বতে ভ্রমণের মাধ্যমে কঠোর সাধনাই নিয়োজিত ছিলেন। সংসারের যাবতীয় সুখ, শান্তি, মোহ ত্যাগ করে শুধুমাত্র গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর নির্দেশে চট্টগ্রাম দেয়াং পাহাড়সহ বিভিন্ন পাহাড় , পর্বত ও প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে স্রষ্টা প্রেমে বিভোর হয়ে সন্ধান লাভ করেন মহাজ্ঞানের। তিনি ছিলেন প্রকৃতির মতো নিরব ও উদার।

একবার যাঁর দিকে দৃষ্টিপাত করেছেন তিনি হয়েছেন অলিয়ে কামেল। বাবা ভাণ্ডারী (ক.) কেবলার সুনজরের আশায় দিনরাত সর্বক্ষণ শিষ্যগণ উনার পবিত্র হুজরা শরীফের দিকে ছাতক পাখির ন্যায় বসে থাকতেন। হজরত কেবলা একবার তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেন, “ মিঞা , উয়হ শাহে জালাল হ্যায়, মুলকে ইয়ামেন কা রওনে ওয়ালা হ্যায়। আলম আরওয়াহ মে ছায়ের করতা হ্যায় ।”( অর্থাৎ “ তিনি জালালিয়তের সম্রাট ইয়ামেন (দূর) দেশের অধিবাসী, তিনি রুহ জগতে ভ্রমণ করেন)। আশেকগণকে তিনি কোনো মৌখিক উপদেশ দেন নি । আশেকগণ ইঙ্গিত, ইশারা বা স্বপ্নযোগে তাঁর আদেশ ,নিষেধ বুঝতে পারত এবং বর্তমানেও তাই। হজরত কেবলার দরবারের ন্যায় তাঁর দরবারেও বিভিন্ন জাতি- ধর্ম- বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষের গমন ছিল ও বর্তমানেও আছে।

তিনি সেমা বা গান , বাজনা সহকারে জিকির পছন্দ করতেন। প্রেমই হলো সকল প্রার্থনার মূল । তিনি সকল মানুষকে খোদা প্রেমে এগিয়ে আসার জন্য রুহানি শক্তি দ্বারা আকর্ষণ করেছেন। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরানে বলেছেন, “ আমার সৃষ্টির মধ্যে এমন এক সম্প্রদায় আসবেন যাঁরা পথভ্রষ্টদের সুপথ দেখাবেন। ” বাবা ভাণ্ডারী যেন খোদার বাণীর অপরূপ প্রতিচ্ছবি। স্রষ্টার সকল সৃষ্টির জন্য মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ তার দ্বার চির উন্মুক্ত করে রেখেছে।

২২ চৈত্র ১৩৪৩ বাংলা,৫ এপ্রিল ১৯৩৭ সাল, সোমবার সকলকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে মহান প্রভুর সান্নিধ্যে গমন করেন। তাঁর পবিত্র রওজা শরীফ থেকে ফয়েজ ও রহমত এখনও বিদ্যমান রয়েছে এবং যা থাকবে অনন্তকাল।

লিখেছেনঃ শেখ বিবি কাউছার, প্রভাষক
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ , রাউজান, চট্টগ্রাম।

AL Sheraz