
যীশু সেন :
সংগীত মানুষের আত্মার ভাষা। এটি কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়; বরং মনন, মানবিকতা ও নান্দনিক চেতনা গঠনের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। বিশেষত শুদ্ধ সংগীত শিক্ষা মানুষের স্মৃতিশক্তি, সৃজনশীলতা ও মানসিক বিকাশে গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সংগীতচর্চা মানুষের আবেগকে সংযত করে, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে এবং সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করে। শিশুকাল থেকেই সংগীতের সঙ্গে সম্পৃক্ততা একজন মানুষকে সংবেদনশীল, সংস্কৃতিমনা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক জীবনে শিশু-কিশোরদের মানসিক ভারসাম্য ও সৃজনশীল বিকাশ নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি শাস্ত্রীয় সংগীতচর্চার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। সংগীত মানুষের একাগ্রতা বৃদ্ধি করে এবং সৌন্দর্যবোধ জাগ্রত করে। শুদ্ধ সংগীতের শিক্ষালাভ একজন শিক্ষার্থীকে কেবল শিল্পী হিসেবে নয়, বরং চিন্তাশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবেও পরিণত করে। এই কারণেই সংগীতশিক্ষা আজ শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক অনুশীলন নয়; এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে শুদ্ধ সংগীতচর্চার প্রসারে যাঁরা নিরলস সাধনা করে চলেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের শিল্পী, সংগীতগ্রন্থ প্রণেতা অধ্যক্ষ রিষু তালুকদার। দীর্ঘদিন ধরে তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতের সঠিক ও শুদ্ধ ধারার চর্চা এবং শিক্ষাদানে আত্মনিয়োগ করেছেন। তাঁর রচিত “শাস্ত্রীয় সংগীত দীপিকা” ও “পাঁচশত রাগের সুর সম্ভার”সহ একাধিক সংগীতগ্রন্থ সংগীতশিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাঁর আন্তরিক তত্ত্বাবধান, অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার মাধ্যমে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী সংগীতজগতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। দেশ-বিদেশে তাঁর শিক্ষার্থীরা আজ সুনামের সঙ্গে সংগীতচর্চা করে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছে।
সম্প্রতি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত একক নজরুলসংগীতানুষ্ঠান “আমারে দিব না ভুলিতে” ছিল তেমনই এক অনন্য সাংস্কৃতিক আয়োজন, যা সংগীতপ্রেমী দর্শকদের হৃদয়ে গভীর আবেগ ও মুগ্ধতার সঞ্চার করে। দিনটা ছিল সোমবার সন্ধ্যায় অঝোর বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে বিপুল সংখ্যক শ্রোতা-দর্শকের উপস্থিতি প্রমাণ করে, শুদ্ধ সংগীতের প্রতি মানুষের আকর্ষণ আজও অটুট।
অনুষ্ঠানে শিল্পী রিষু তালুকদার তাঁর সুরেলা কণ্ঠ, নিখুঁত তাল-লয় এবং আবেগঘন পরিবেশনার মাধ্যমে নজরুলসংগীতের সৌন্দর্যকে নতুনভাবে তুলে ধরেন। প্রেম, দ্রোহ, ভক্তি, মানবতা ও দেশাত্মবোধের নানা অনুভূতিতে সাজানো তাঁর পরিবেশনা মিলনায়তনে সৃষ্টি করে এক সুরময় ও হৃদয়স্পর্শী আবহ। “আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন”, “শাওন আসিল ফিরে”, “তোমার বীণা তারের গীতি”, “হে প্রিয় আমারে দিব না ভুলিতে”, “আমায় নহে গো ভালোবাস শুধু” ও “শাওন রাতে যদি”সহ প্রায় বিশটি জনপ্রিয় নজরুলসংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তিনি শ্রোতাদের এক আবেগঘন সাংস্কৃতিক ভ্রমণে নিয়ে যান। প্রতিটি গানের পর দর্শকদের করতালি ও উচ্ছ্বাস যেন শিল্পীর শিল্পসাধনার যথার্থ স্বীকৃতিই বহন করছিল।
বাগীশ্বরী সংগীতালয়ের সভাপতি লায়ন কৈলাশ বিহারী সেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৈয়ব চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সংগীতশিল্পী রিয়াজ ওয়ায়েজ এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তরুণ ভট্টাচার্য। বাচিকশিল্পী অদিতি সাহার প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
স্বাগত বক্তব্য রখেন বাগীশ্বরীর নজরুলজয়ন্তী উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক সাংবাদিক যীশু সেন। আরও বক্তব্য রাখেন সদস্যসচিব প্রকৌশলী রিমন সাহা, ব্যাংকার উৎপল চক্রবর্তী, ডা. সৌমিত্র দাশ, শিক্ষক সমীরন সেন, প্রভাষক ঝুমুর খাস্তগীর, এড. সব্যসাচী আচার্য, শিক্ষক এ্যানি নাথ প্রমুখ।
প্রধান অতিথি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৈয়ব চৌধুরী বলেন, নজরুল কেবল একজন কবি নন; তিনি বাঙালির চেতনা, প্রতিবাদ ও মানবতার প্রতীক। অন্যান্য বক্তারাও তাঁদের বক্তব্যে বলেন, বিদ্রোহ, সাম্য, প্রেম ও মানবতার চিরন্তন বাণী নিয়ে নজরুল আজও বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম প্রেরণার উৎস। তাঁর সাহিত্য ও সংগীত শুধু শিল্পচর্চার বিষয় নয়; বরং এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমান প্রজন্মের মাঝে নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবিক আদর্শ ছড়িয়ে দিতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলেও বক্তারা মত প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানের আরেকটি আকর্ষণ ছিল বাগীশ্বরী সংগীতালয়ের অগ্রজ ও অনুজ শিক্ষার্থীদের সমবেত সংগীত পরিবেশনা। “জাগো নারী জাগো” ও “দূর দ্বীপবাসিনী” গান দুটি পরিবেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নজরুলসংগীতের দলীয় সৌন্দর্য ও শুদ্ধ পরিবেশনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। তবলা সংগতে ছিলেন পলাশ দে ও সৌমেন দাশ। পাশাপাশি নাট্য শাস্ত্রম্-এর শিল্পীদের দলীয় নৃত্য অনুষ্ঠানটিকে আরও বর্ণিল ও প্রাণবন্ত করে তোলে। হৃদিতা দাশ, জয়ীতা দত্ত, রাইমা দাশ, অর্চিতা দাশ ও রাত্রি ধরের নৃত্য পরিবেশনা দর্শকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে।
বাগীশ্বরী সংগীতালয়ের পক্ষ থেকে শিল্পী রিষু তালুকদার ও সম্মানিত অতিথিবৃন্দকে ফুলেল শুভেচ্ছা, উপহার এবং সম্মাননা স্মারক ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
সমগ্র অনুষ্ঠানে যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন কীবোর্ডে সৃজন রায়, তবলায় অমর্ত্য চক্রবর্তী, বাঁশিতে প্রাণেশ ভট্টাচার্য, গিটারে সুচয়ন দে এবং অক্টাপ্যাডে নন্দন নন্দী। তাঁদের সমন্বিত পরিবেশনা পুরো অনুষ্ঠানকে এক ভিন্নমাত্রা দেয়। একই সঙ্গে বাগীশ্বরী সংগীতালয়ের অসংখ্য শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, সংগীতচর্চার এই ধারা নতুন প্রজন্মের মধ্যেও ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
বর্তমান সময়ে যখন অপসংস্কৃতি, অস্থিরতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় সমাজকে ক্রমাগত গ্রাস করছে, তখন শুদ্ধ সংগীতচর্চা ও নজরুলভাবনার পুনর্জাগরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সংগীত মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, মনকে শান্ত করে এবং মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে। বিশেষত নজরুলের সাহিত্য ও সংগীত সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার যে চেতনা ধারণ করে, তা আজকের সমাজে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
রিষু তালুকদারের মতো শিল্পীদের নিরলস সাধনা এবং এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন নতুন প্রজন্মকে শুদ্ধ সংগীত ও সৃজনশীলতার পথে উদ্বুদ্ধ করছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল মহলের উচিত এ ধরনের উদ্যোগকে আরও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা, যাতে সংগীত ও সংস্কৃতির এই আলোকধারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যেও সমানভাবে বিকশিত হয়। কারণ একটি জাতির সাংস্কৃতিক শক্তিই তার প্রকৃত পরিচয় ও সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করে। অনুষ্ঠানের শেষ দিকে বাগীশ্বরী সংগীতালয়ের শিক্ষার্থীরা
দলীয় সংগীতে অংশগ্রহণ করেন - ডা. সৌমিত্র দাশ, মৌমিতা বিশ্বাস, রিয়া দে, বিজয় দেবনাথ, কাঞ্চন দাশ, প্রিয়া দেব, ঝুমুর খাস্তগীর, মিথুন দাশ, চিন্ময় দে, প্রিয়ন্তী দাশ পূর্বা, বৃষ্টি চক্রবর্তী, সৌরভ সাহা, সমীরণ সেন, তৃষ্ণা দেবনাথ, স্নিগ্ধা দাশ, নিলয় সেনগুপ্ত, দীপা মিত্র, ললিত নারায়ণ দাস, স্নেহা মজুমদার, ঝিনুক রাণী নাথ, এড. সব্যসাচী আচার্য, ছন্দা শর্মা, শুভ্রা চৌধুরী, লাবনী দত্ত, হিমেন গুহ, পারমিতা চৌধুরী, স্বস্তিকা মজুমদার, পূর্ণা বণিক, অস্মিতা বড়ুয়া, নিকিতা বিশ্বাংগ্রী, অর্জুন তালুকদার, অপর্ণা চৌধুরী, স্নেহা দাশ, নিধি রুদ্র, মো. আলমগীর, সৌরি বড়ুয়া, অদ্রি সেন, সজীব চৌধুরী, অর্পিতা দাস, সনাতন দাশ, আকাশ দত্ত, অদ্রিতা চৌধুরী, ঋষিক রায়, অংকিতা সেন, অধর দত্ত, বৃষ্টি ঘোষ,আদ্রিতা চৌধুরী, ভবতোষ রুদ্র, সুদীপ্ত দাশ, সৃষ্টি বণিক, প্রিয়ন্তী দাশ, নয়ন গুহ, অনিন্দিতা চৌধুরী, নিলাদ্রী দাশ, কৈলাশ বিহারী সেন, চুমকী নন্দী, টিসু সেন, রিয়া দাশ, আনন্দ সেন, বর্ণা দে, মনিষা সরকার, রিমন সাহা, উমা সেন, অপূর্ব শীল, তৃষ্ণা দাশ, মম দাশ, স্বস্তিকা নন্দী, তীর্থ শীল, আরাধ্যা চক্রবর্ত্তী, অহর্নিশ সাহা, পুনম দাশ,সুইটি বর্মন, শ্রেয়া দাশ, রাজদীপ দাশ, অপূর্বা তালুকদার, মৌবনী সেনগুপ্তা, অহেনজিতা দাশ, সোহান হোসেন, অদ্রিজা চৌধুরী, অদ্রিতা ব্যানার্জি, অমৃতা চক্রবর্তী, পারমিতা চন্দ, ঐন্দ্রিলা চক্রবর্তী, প্রিয়ন্ত দাশগুপ্ত, পৃথুরাজ দাশ দীপ, কোমল ধর, তৃষাগ্নী তালুকদার প্রমূখ।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে বক্তারা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও আদর্শ সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়া আহব্বান জানান।নজরুলজয়ন্তীতে শিল্পী রিষু তালুকদারের একক নজরুলসংগীতানুষ্ঠান সুরময়, উৎসবমুখর পরিবেশনায় হৃদয়স্পর্শী সাংস্কৃতিক আবহে মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
লেখক : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
প্রধান সম্পাদকঃ মীর আসলাম, সম্পাদক ও প্রকাশকঃ কামরুল ইসলাম বাবু, নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ ওসমান গনি