মুসলিম ঐতিহ্যের তিন উজ্জ্বল নক্ষত্র: সমাজ ও জ্ঞানে নারী জাগরণের ইতিহাস

AL Sheraz

ইসলামের ইতিহাসে কালজয়ী তিন নারী: আদর্শ সমাজ ও নারী জাগরণের অনন্য আলোকবর্তিকাঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগ থেকে শুরু করে হাজার বছরের মুসলিম ইতিহাসে নারীরা জ্ঞানচর্চা, সমাজসেবা, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে যে অভূতপূর্ব অবদান রেখেছেন, তা সমকালীন বিশ্বের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। শালীনতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বজায় রেখেও যে একজন নারী সমাজ ও রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারেন, ইসলামের ইতিহাস তার জীবন্ত সাক্ষী।

সপ্তম শতাব্দী থেকে পরবর্তী প্রায় ১৩০০ বছরের খিলাফত শাসনামলে হাজার হাজার মুসলিম নারী আইনবিদ, বিজ্ঞানী, বিচারক, ভাষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) দনিয়ার চারজন শ্রেষ্ঠ নারীর কথা উল্লেখ করেছেন; তাঁরা হলেন হযরত মরিয়ম (আ.), হযরত আসিয়া (আ.), হযরত খাদিজা (রা.) ও হযরত ফাতেমা (রা.)। ইসলামের হাত ধরেই নারী সর্বপ্রথম তার মানবিক অধিকার ফিরে পায়। ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মুসলিম এবং প্রথম শহীদ উভয়ই ছিলেন নারী। অভাব-অনটন আর শত কষ্টের মাঝেও তাঁরা যে আদর্শ জীবন যাপন করেছেন, তা আজ আমাদের ক’জনই বা জানি?

নিচে ইসলামের ইতিহাসের কালজয়ী তিন মহীয়সী নারীর জীবন ও কর্ম সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

১. হযরত খাদিজা (রা.): স্বাধীনচেতা উদ্যোক্তা ও আস্থার প্রতীক

ইসলামের প্রথম স্তম্ভ হিসেবে যার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা, তিনি হলেন হযরত খাদিজা (রা.)। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে তিনি একজন সফল ও স্বাধীন ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। পৈতৃক ব্যবসার হাল ধরে তিনি তাঁর ব্যবসায়িক পরিধি আরবের সীমানা ছাড়িয়ে সুদূর সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিলেন।

রাউজান প্রেসক্লাবের ইফতার মাহফিলে বক্তারা ‘রমজান শুধু রোজা রাখার মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি ও হৃদয়ের চিকিৎসার শ্রেষ্ঠ সময়’

ইতিহাসবিদ বেটানি হিউজ-এর মতে, তাঁর ব্যবসায়িক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতাই শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসের মোড় বদলে দিয়েছিল। নবুওয়াতের কঠিন দিনগুলোতে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য ছিলেন সাহস ও শক্তির উৎস। হেরার গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকাকালীন খাবার সরবরাহ থেকে শুরু করে নবুওয়াত প্রাপ্তির পর মানসিক প্রশান্তি সবক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। ইসলাম প্রচারের স্বার্থে তিনি তাঁর অর্জিত বিপুল সম্পদ অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে ত্যাগের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

২. হযরত ফাতেমা (রা.): ধৈর্য ও অনাড়ম্বর জীবনের আদর্শ

নবী-নন্দিনী হযরত ফাতেমা (রা.) ছিলেন গোটা বিশ্বের নারীজাতির জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ। বিলাসিতা ও পার্থিব সুখ বিসর্জন দিয়ে তিনি পরকালের পাথেয় সংগ্রহে নিমগ্ন থাকতেন। তবে সাংসারিক দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ। নিজ হাতে ঘরের কাজ সম্পন্ন করার মধ্যেই তিনি আনন্দ খুঁজে পেতেন।

তিনি ছিলেন জান্নাতের সর্দার ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মহীয়সী মাতা এবং শেরে খোদা হযরত আলী (রা.)-এর সহধর্মিণী। সত্যের সাধনা, আমানতদারি ও নম্রতা ছিল তাঁর চরিত্রের ভূষণ। মায়ের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিপুল সম্পদ তিনিও অবলীলায় ইসলামের সেবায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন। কোনো অভুক্ত বা সাহায্যপ্রার্থী তাঁর দুয়ার থেকে কখনো খালি হাতে ফিরে যায়নি।

৩. হযরত আয়েশা (রা.): জ্ঞানের এক প্রজ্জ্বলিত বাতিঘর

হযরত আয়েশা (রা.) ছিলেন সমকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদুষী নারী। কুরআন, হাদীস, ইসলামী আইন (ফিকহ), চিকিৎসাশাস্ত্র এমনকি যুদ্ধবিদ্যায়ও তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। সর্বাধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারী আটজন সাহাবীর মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহর ক্রান্তিলগ্নে তিনি শিক্ষক ও অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন। বড় বড় সাহাবী ও তাবেয়ীগণ জটিল মাসআলার সমাধানের জন্য তাঁর দ্বারস্থ হতেন। আরবী ভাষা ও লোকগাথা বিষয়েও তাঁর ছিল গভীর জ্ঞান। মূলত মুসলিম সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির ভিত্তি স্থাপনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

বর্তমান সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধে এবং একটি মানবিক ও সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনে এই মহীয়সী নারীদের জীবনী চর্চা অপরিহার্য। তাঁদের আদর্শ যদি বর্তমান প্রজন্মের নারীরা হৃদয়ে ধারণ করতে পারেন, তবে আমরা কেবল একটি শিক্ষিত জাতিই নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল ও আদর্শ সমাজ উপহার পাব।

বিশেষ নিবন্ধ | শেখ বিবি কাউছার প্রভাষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ, রাউজান, চট্টগ্রাম

AL Sheraz
AL Sheraz